ঈদে মিলাদুন্নবী কি? ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে হাদিস ও দলিল।

ঈদে মিলাদুন্নবী কি ও ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক কি না সেই বিষয়েই হাদিস ও আল কোরআন এর দলিল সহ আলোচনা করা হবে আজকের এই আর্টিকেলে। ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবার জন্য পুরো লেখাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন।

ঈদে মিলাদুন্নবী কি?

ঈদে মিলাদুন্নবী; যার আরবি প্রতিশব্দ হলো “مَوْلِدُ النَبِيِّ‎‎”। ঈদে মিলাদুন্নবী হলো ইসলামের শেষ নবি ও রাসুল হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর আগমন উপলক্ষে মুসলিমদের মাঝে পালিত এক আনন্দ উৎসব। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ১২ ই রবিউল আউয়াল হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। যদিও এই তারিখ নিয়ে অনেকের মাঝেই মতো বিরোধ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ৯ই রবিউল আউয়াল। যদিও প্রায় সব জায়গায় ১২ রবিউল আউয়াল হিজরিতেই ঈদে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর জন্ম তারিখ ১২ রবিউল আউয়াল কিনা এই বিষয়ে অনেকের মাঝেই মত পার্থক্য থাকলেও তিনি যে ১২ই রবিউল আউয়াল হিজরিতেই ওফাত বরন (শেষ নিশ্বাস ত্যাগ) করেন এই বিষয়ে কারোর মাঝে কোন মতো বিরোধ নাই। অর্থাৎ রাসুল (সাঃ) এর জন্ম দিন ও মৃত্যু দিন একিই দিনে।।

যেহেতু জন্ম দিন ও মৃত্যু দিন একিই দিনে, সেহেতু মুসলিম সমাজের জন্য এটি একিই সাথে যেমন আনন্দের আবার তেমনি কষ্টদায়ক। আর এই কারনেই অনেকেই এই দিনে আনন্দ উৎসব পালন করেন না ও পালনে নিরুৎসাহিত করে থাকেন। আমাদের বাংলাদেশে এই দিনটাকে মিলাদুন্নবী হিসেবে বলা হলেও অন্যান্য জায়গায় অন্যান্য নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম গন এই দিনটাকে নবী দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

জরের নামাজের ওয়াক্ত সম্পর্কে জানতে এই আর্টিকেল টি পড়তে পারেন।

ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে হাদিস ও কোরআনঃ

ঈদে মিলাদুন্নবী হাদিসের আলোকে আলোচনা
ঈদে মিলাদুন্নবী হাদিসের আলোকে আলোচনা

ঈদে মিলাদুন্নবীর উৎপত্তি কিভাবে?

মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর মৃত্যুর ও অনেক পরে থেকে এই মিলাদুন্নবীর প্রচলনে ঘটে। মহানবী (সাঃ) এর জীবদ্দশায় ও সাহাবিদের সময়কালেও এই ঈদে মিলাদুন্ন নামে কোন কিছুই ছিল না। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ প্রতি সোমবার করে রোজা রাখতেন এবং তাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে জবাবে তিনি বলেন, সোমবারে তিনি জন্ম গ্রহন করেছেন এবং এই দিনেই তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হয়েছেন আর সেই কারনেই শুকরিয়া স্বরুপ এই দিনে রোজা রাখতেন।

প্রতি সোমবারে বিশ্বনবী কেন রোজা রাখতেন এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন –  

ﻋَﻦْ ﺍَﺑِﻰ ﻗَﺘَﺪَﺓَ ﺍﻻَﻧْﺼﺎَﺭِﻯ ﺭَﺿِﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋَﻨﻪُ ﺍَﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ

ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺱﺀﻝ ﻋَﻦْ ﺻَﻮْﻡِ ﻳَﻮْﻡ ﺍﻻِﺛْﻨَﻴْﻦِ ﻗَﻞَ ﺫَﺍﻙَ ﻳَﻮْﻡٌ ﻭُﻟِﺪْﺕُ ﻓِﻴْﻪِ ﺑُﻌِﺜْﺖُ ﺍَﻭْﺍُﻧْﺰِﻝَ ﻋَﻠَﻰَّ ﻓِﻴْﻪِ –

“এই দিনে আঁমার বেলাদত শরীফ হয়েছে, এই দিনে আঁমি প্রেরিত হয়েছি এবং পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ এই দিনেই আঁমার উপর নাজিল হয়েছে।”

সোমবার রোজা রাখার দলিলঃ

  • সহীহ মুসলিম শরীফ ২য় খন্ড, ৮১৯ পৃষ্ঠা।
  • বায়হাকী: আহসানুল কুবরা,৪র্থ খন্ড, ২৮৬ পৃষ্ঠা।
  • মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল,৫ম খন্ড, ২৯৭ পৃষ্ঠা।

এছাড়াও প্রতি সোমবার রোজা রাখার পেছনে আরেকটি কারন উল্লেখ করে রাসুল (সাঃ) বলেন –

عن أبي هريرة : أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال تعرض الأعمال يوم الإثنين والخميس فأحب أن يعرض عملي وأنا صائم

“হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন: সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল উপস্থাপন করা হয় [আল্লাহর কাছে]।আর আঁমার আমল উপস্থাপন করার সময় রোযারত থাকাকে পছন্দ করছি।”

এই হাদিসের দলিলঃ

  • সুনানে তিরমিজী, হাদিস নাম্বার -৭৪৭
  • সুনানে নাসায়ী কুবরা, হাদিস নাম্বার -২৬৬৭
  • মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নাম্বার -২১৭৫৩

হিজরি ৪র্থ শতাব্দীর প্রায় মাঝের দিকে ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রথম প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীতে ৭ম হিজরির দিকে এই মিলাদুন্নবী ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই মিলাদুন্নবীর প্রথম প্রবর্তনা খলিফা আল মুয়িজ্জু লি-দীনিল্লাহ। ৪র্থ হিজরি থেকে এটি শুরু হলেও আনুষ্ঠানিক রূপ পায় ৭ম হিজরিতে। তাই এটা বলায় যায় রাসূল (সাঃ), সাহাবী গন দের সময়ে কোন ঈদে মিলাদুন্নবী বলতে কিছুই ছিল না। এই ৭ম হিজরি ছিল ইসলাম পরবর্তী বর্বর যুগ। এই যুগে মুসলিমগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের মাঝে প্রায়ই গৃহযুদ্ধ লেগে থাকত।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই আর্টিকেল টি পড়তে পারেন।

ঈদে মিলাদুন্নবীর স্বপক্ষে দলিলঃ

এখন, যারা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করেন ও এটিকে সমর্থন করেন তাদের দেওয়া কিছু যুক্তি হলো। আল্লাহ তায়ালা আল কোরআনে বলেন।

“আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত প্রাপ্তিতে খুশি পালন কর যা তোমাদের সমস্ত ধন দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়।” – (সূরা ইউনুস-৫৮)

অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি নিশ্চয় আপনাকে পুরো বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি”।

তো এখান থেকে বোঝা যায় যে, যেহেতু এই দিনে রাসুল সাঃ এর আগমন ও নবুয়ত প্রাপ্তি হয়েছে তাই আমরা চাইলেই এই দিনটাকে ঈদ হিসেবে পালন করতেই পারি। কিন্তু সমস্যা হলো এই একিই দিনে আবার রাসূল সাঃ ওফাত বরন করেন। তাহলে যেদিন আমাদের রাসুল সাঃ মৃত্যু বরন করলেন সেইদিনে কিভাবে একজন মুসলিম হিসেবে আপনি আনন্দ উৎসব করতে পারেন? তাই

এই দিনে আনন্দ মিছিল ও উৎসবের আয়োজন করা একেবারেই যুক্তিহীন। আমরা চাইলে অবশ্যই এইদিনে মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর জন্ম ও মৃত্যুদিন হিসেবে ইবাদত বন্দেগি করতেই পারি, চাইলেই রোজাও রাখতে পারি, তার জীবনি নিয়ে আলোচনা করতে পারি। এইসব বিষয় নিয়ে কোন সমস্যা নাই। কিন্তু আমাদের উচিত না কোন বিষয় নিয়েই বাড়াবাড়ি করা। কেননা রাসূল সাঃ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।

ঈদে মিলাদুন্নবী তে আমাদের করনীয় কি?

ইসলামে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। আর ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতেও সম্পুর্ন নিষেধ করেছেন রাসুল (সাঃ)। এই সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আল কোরআনে ইরশাদ করেছেন।

“কিতাবধারী হে! নিজেদের ধর্ম নিয়ে অযথা বাড়াবাড়ি কোরো না। আর (ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে) তোমাদের আগে যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়ে ও অন্যদেরকে পথভ্রষ্ট করে সহজ সরল পথচ্যুত হয়েছে, তাদের পথ অবলম্বন কোরো না।” (সুরা মায়িদা : ৭৭)

“হে কিতাবধারীরা! তোমরা তোমাদের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়ো না। আর আল্লাহ সম্বন্ধে যথাযথ বলো।” (সুরা নিসা : ১৭১)

উপরের আয়াত দুইটির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ইসলামে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কোন স্থান নাই। তাই আমাদের উচিত না এইসব বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা। যেহেতু এই বিষয় নিয়ে ইসলাম বিশেষজ্ঞদের মাঝে মতো বিরোধ রয়েছে আর এটি কোন ফরজ বা ওয়াজিব বা সুন্নাত কোন ইবাদত ও না অথবা এটি এমন কিছুও না যে যেটি না করলে আমাদের গুনাহ হবে তাই এইসব এড়িয়ে চলায় আমাদের জন্য উত্তম।

বিদাই হজ্বের ভাষনে রাসূল (সাঃ) সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে যে ভাষন দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন-

“আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যতদিন আকড়ে ধরবে ততদিন পথভ্্রষ্ট হবে না। একটি হলো আল্লাহর কিতাব এবং অপরটি আমার সুন্নাহ্” (মিশকাত-১ম খন্ড হাদিস নং-১৭৭)

অর্থাৎ রাসুল (সাঃ) আমাদের বলে গেছেন আমরা যেন কেবল মাত্র আল্লাহ প্রদত্ত আল কোরান ও রাসূল (সাঃ) এর হাদিস অনুসরণ করি তাহলেই আমরা কখনো পথভ্রষ্ট হব না। আর আমাদের ও সেটিই করা উচিত৷ বর্তমান সময়ে। আর যেহেতু কোরান হাদিসে এই মিলাদুন্নবী সম্পর্কে সরাসরি কোন হুকুম নাই তাই আমাদের উচিত এসব থেকে দূরে থাকা।

কোরান হাদিসের মাধ্যমে আমাদের উপর যে হুকুম গুলো দেয়া হয়েছে সেই সবের বাইরে গিয়ে কোন কিছু করা মানেই ঝামেলায় জড়ানো। একজন মুসলিম হিসেবে নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত সহ অন্যান্য সকল ফরজ সুন্নত ও ওয়াজিব আমাদের পালন করা উচিত। এইসব নফল বা মুস্তাহাব বিষয় নিয়ে নিজেদের মাঝে ফেতনা সৃষ্টি করা নেহাত বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। যেহেতু হযরত মোহাম্মদ সাঃ শেষ রাসুল ও নবী এবং এর কোন নবী রাসুল এই পৃথিবীতে আসবে না, তাই আমাদের উচিত হলো কোরান হাদিস অনুসরণ করে সেই অনুযায়ীই জীবনযাপন করা।

ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে আরো জানতে উইকিপিডিয়াই দেখতে পারেন এই সম্পর্কেঃ

আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে সেইটুকু সম্ভব কোরান হাদিসের আলোকে আমি আলোচনার মাধ্যমে আপনাদের বুঝানোর চেষ্টা করলাম। কোরান বা হাদিসের বিরুদ্ধে যদি কিছু এখানে আমি বলে থাকি তবে অবশ্যই সেটি বর্জনীয়। কোথাও ভূল কিছু বলে থাকলে অথবা কিছু জানার থাকলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ।

Share:

9 thoughts on “ঈদে মিলাদুন্নবী কি? ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে হাদিস ও দলিল।”

  1. “আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত প্রাপ্তিতে খুশি পালন কর যা তোমাদের সমস্ত ধন দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়।” – (সূরা ইউনুস-৫৮)

    ‘আনন্দ’ বা ‘খুশি’ বলা হয় ঐ অবস্থাকে যা কোন আকাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জনের ফলে মানুষ নিজ মনে অনুভব করে। মু’মিনগণকে বলা হচ্ছে যে, এই কুরআন আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত, এ অনুগ্রহ লাভ করে মু’মিনগণের আনন্দিত হওয়া উচিত। এর অর্থ এই নয় যে, আনন্দ প্রকাশ করার জন্য জালসা-জলুস করে, আলোকসজ্জা বা অন্য কোনরূপ অপচয়ের অনুষ্ঠান উদ্যাপন করবে। যেমন বর্তমানের বিদআতীরা উক্ত আয়াত দ্বারা ‘নবীদিবস’ ইত্যাদি অভিনব বিদআতী অনুষ্ঠান বৈধ হওয়ার কথা প্রমাণ করতে চায়।

    তাফসীরে আহসানুল বায়ান

    Reply
    • তাফসিরে ইবন কাসীরে এ আয়াতের “রহমত” ও “অনুগ্রহ” প্রাপ্তিকে “করআন” প্রাপ্তি বোঝানো হয়েছে নাকি রসুলুল্লাহ (ﷺ) কে বোঝানো হয়েছে? দলিলের পর দলিল দিয়ে শেষ করা যাবে না এ দিনের বর্ননায়। এমনকি আপনাদের আহলে হাদীস, সালাফি ঘরানার পূর্ববর্তী গুরুদের মধ্যেও ১৯২৪ এর আগে মদীনা ও মক্কায় তা পালিত হত। ১৪০০ বছর যা পালন হয়েছে বিগত ৯৯ বছরে তা সব উল্টে গেল?

      Reply
  2. লেখকের বলা উচিত ছিল সে কোন ঘরানার ইসলাম করে। here’s another perspective on the Eid e Milad Un Nabi (Sa.)

    কোথা থেকে এলো ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন?
    ————————————————————-
    হাদিসের ৬ খানা বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ কিতাবের অন্যতম সুনানুত তিরমিজি শরিফে একখানা আলাদা চ্যাপ্টার আছে “বাবু মা জায়া ফি মিলাদিন্নাবি ﷺ” অর্থ্যাৎ “প্রিয়নবী ﷺর জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে যা এসেছে” নামে। ওই অধ্যায়ের হাদিসও দিলাম নিম্নে দেখুন। দেখুন সাহাবায়ে কেরাম হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺর জন্মবৃত্তান্ত অর্থ্যাৎ মিলাদুন্নবী নিয়ে আলোচনা করতেন কীনা! এরকম অসংখ্য হাদিস এসেছে হাদিস, সিরত, দালায়েলু ন্নুবুয়্যাহ, শামাইল এবং তাবাকাত এর কিতাবে সনদসহ। এসবের প্রাতিষ্ঠানিক রুপ হচ্ছে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন, এখন আমরা যা করছি।

    সাহাবায়ে কেরাম সুন্নাহ শুনেছেন, দেখেছেন কিন্তু সুন্নাহ স্টাডির প্রাতিষ্ঠানিক রুপ তখন ছিল না। পরবর্তীতে মাদ্রাসা সিস্টেমে সেটা হয়েছে ” উলুমুল হাদিস” নামে। তাফসির শুনেছেন কিন্তু তা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়নি, পরে এটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায় “ইলমুত তাফসির” নামে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে ইলমুত তাফসির নামে আলাদা কোন সাব্জেক্ট ছিল না। শ্রেষ্ঠ মুফাসসির হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এঁর জন্য নবি করিম ﷺ এই বলে দোয়া করেছেন, “আল্লাহুম্মা আল্লিমহুত তা’ভিল, ওয়া ফাককিহহু ফিদ্দিন”। কুরআন মাজিদের তাভিল শিক্ষা দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, দ্বীনের বুঝ দেয়ার জন্য দোয়া করেছেন। এই তাভিলই পরে হয় তাফসির শাস্ত্র। অর্থ কুরআন মাজিদের ব্যাখ্যা।

    প্রিয়নবীﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে আত্মশুদ্ধি চর্চার শাস্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক নাম হয় অনেক পরে ইলমুত তাসাউউফ। এভাবে শত বিষয় বলতে পারব যা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে প্রচলিত ছিল যা পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক নাম ও রুপ পায়। নামে কী আসে যায়? সেক্সপিয়ার বলেছিলেন। আর আরবে বলে, লা মুশাহহাতা ফিল ইসতিলাহ। কোন নামে কী হচ্ছে তাতে কী আসে যায়! যা নামেই হোক কাজ কী করা হচ্ছে সেই নামের আড়ালে, সেটাই মূল বিষয়। হারাম কাজকর্ম দ্বারা যদি কেউ ঈদে মিলাদুন্নবী মাহফিল করে তবে তা সর্বোতভাবে হারাম। নারী পুরুষ একত্রিত হয়ে খেমটা নাচ ও গান বাজনা উদাহরণস্বরূপ। অথবা ডিজে পার্টি, হিন্দি গান যদি বাজে। মায়াজাল্লাহ।

    এটা তো কমনসেন্স। কে এগুলোকে জায়েজ বলবে?
    কিন্তু কুরআন মাজিদের তিলাওয়াত, হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺর শান-মান, প্রশংসা, মুহাব্বাত, সুন্নাহ, আদর্শ, শিক্ষা, বৈশিষ্ট্য, গঠন ইত্যাদি আলোচনা, দরুদ ও সালাম পাঠ, নাতে রাসূল পাঠ, জিকির, মানুষকে খাবার খাওয়ানো এই কাজগুলো যা আমরা ঈদে মিলাদুন্নবী মাহফিলে করে থাকি। এই সবগুলো কাজের পক্ষে আলাদা আলাদাভাবে সহিহ হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল আছে। এখানে কোন কাজটা হারাম? কোনটাই না।

    এখন বলবেন, আলোকসজ্জা, গেইট, তোরণ, জশনে জুলুসের র‍্যালী ইত্যাদি কোথা থেকে এলো? আমাদের বুঝা দরকার এই কাজগুলো কোন ইবাদাত না। এগুলো হচ্ছে সাকাফাত বা সংস্কৃতি। রমাদানে আরবের প্রায় সব দেশে সাজসজ্জা হয়। এগুলো কী ইবাদাত নাকি যে আমরা বেদাতের ফতোয়া দেব? ইবাদাত ও সাকাফাতের পার্থক্যটা আমরা খুব কম মানুষই বুঝি। ইবাদাত ও সওয়াব লাভের আশায় কোন কিছু করা হলে যার কোন অস্তিত্বই ইসলামে নাই, কুরআন সুন্নাহের বিপরীত এমন কাজ বেদাতে সায়্যিয়াহ বা খারাপ পথভ্রষ্ট বেদাত যা পরিত্যাজ্য।

    আজ ৯০% মুসলমানের এই দেশে হিন্দু দেবতাদের নামে র‍্যালী হয়, আলোকসজ্জা, গেইট, তোরণ ইত্যাদি নির্মাণের মাধ্যমে পৌত্তিলিকতাকে প্রমোট করা হচ্ছে৷ অবশ্যই এটা তাদের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার। আমরা কোনভাবেই এগুলোতে বাধা দিতে পারি না সেকুলার এই বাংলাদেশে। আমরা অহিংসার পক্ষে ১০০%৷ সকল ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে আমরা।

    ৯০% মুসলমানের দেশে আমরা কেন আমার নবীর নামকে উর্ধ্বে তোলে ধরতে পারব না? যিনি সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতুল্লিল আলামিন। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে আমাদের ইয়াং জেনারেশনকে বিপথগামী করছে অন্য ধর্ম ও মতের মানুষেরা। আমরা মুবাহ জায়েজ এমন বিকল্প কালচার ও সংস্কৃতি না দেয়ার কার‍ণে এরা এখন স্বরসতী পুজা, দূর্গা পূজা, কালি পূজা ইত্যাদিকে জাতীয় উৎসব মনে করে পালন করছে। পহেলা বৈশাখে হাতি পেঁচা ইত্যাদি নিয়ে মংগল শোভাযাত্রা করে। হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺর পরিবর্তে মায়াজাল্লাহ বলতেও কেমন লাগে, মেসি, রোনালদো নায়ক গায়ককে আইডিওলাইজ করছে আমাদের ইয়াং জেনারেশন। কাকে আইকন হিসেবে দেখার কথা আর কাকে দেখছে তারা! কেন হচ্ছে এসব? চিন্তা করুন।

    কাজেই মিলাদুন্নবী, শবে বরাত, শবে মেরাজ, ওরস ফাতেহা ইত্যাদি আরো জৌলুসপূর্ণভাবে করা দরকার আমাদের আবহমান সংস্কৃতির অংশ হিসেবে। এগুলোর সবকিছু সওয়াব ও ইবাদাতের নিয়তে হয় না। সময়ের বিশেষ প্রয়োজনে হয়।

    সূরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াত, সূরা দোহার সর্বশেষ আয়াত, সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নং, মায়েদার ১১৪, আলে ইমরানের ১৬৪ ও ৮১ নং আয়াতসহ আরো বহু আয়াত দিয়ে আমি দলিল দিতে পারি ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺউদযাপনের পক্ষে। সেদিকে আমি যাব না। মদিনা শরিফে নবী করিম ﷺযখন পৌঁছান তখন সকল মদিনাবাসী “তালায়া’ল বাদরু আ’লাইনা” গেয়ে দফের তালে তালে হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বরণ করে নিয়েছেন জুলুস বা র‍্যালী করে যা মুসলিম শরিফেও এসেছে সংক্ষেপে আনাস বিন মালিক রা. থেকে৷ সিরতের সবচাইতে নির্ভরযোগ্য কিতাব সিরতে ইবনে ইসহাক ও সিরতে ইবনে হিশামের গ্রহণযোগ্য বর্ণনা, হজরত ওমর ফারুক রা. ও সায়্যিদুশ শুহাদা আমির হামজা রা. ইসলাম গ্রহণের পর তাঁদের দুজনকে সামনে রেখে, অর্থ্যাৎ সাহাবায়ে কেরামের দুইভাগের নেতৃত্বে দুজনকে রেখে নবী করিম ﷺ র‍্যালী বা মিছিল করে ইসলামের প্রথম অনানুষ্ঠানিক মাদ্রাসা বা খানকা “দারুল আরকাম” থেকে কা’বা শরিফ পর্যন্ত গিয়ে প্রকাশ্যে নামাজ আদায় করেছেন, প্রথমবারের মত সবাইকে নিয়ে জামায়াতের সাথে। এসব দলিল আমি দিচ্ছি না। বরং আমি বলছি এসব আমাদের সংস্কৃতি। এসব প্রয়োজন। কখন কী নামে শুরু হল তা বিষয় না।

    কাইস ইবনু মাখরামা রা. থেকে বর্ণিতঃ
    তিনি বলেন, আমি ও রাসূলুল্লাহ ﷺহস্তী বছরে (আবরাহার বাহিনী ধ্বংসের বছর) জন্মগ্রহণ করি। তিনি বলেন, ইয়াসার ইবনু লাইস গোত্রীয় কুবাস ইবনু আশইয়ামকে উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) প্রশ্ন করেন, আপনি বড় নাকি রাসূলুল্লাহ ﷺ? তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার চাইতে অনেক বড়, তবে আমি তাঁর আগে জন্মগ্রহণ করি। রাসূলুল্লাহ ﷺহাতীর বছর জন্ম গ্রহণ করেছেন। আমার মা আমাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন যেখানে গিয়ে আমি পাখিগুলোর (হাতিগুলোর) মলের রং সবুজে বদল হয়ে যেতে দেখেছি।
    জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৩৬১৯

    কৃতঃ সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারী

    Reply
  3. ভাই নামেই যখন সমস্যা..
    আর কোন সমস্যা নাই, তাহলে নামটা যদি চেইঞ্জ করে অন্য কোন নাম রাখা হয় যা নিয়ে আর কোন জটিলতা থাকবেনা। এরকম যদি হতো তাহলে কতইনা ভাল হতো। আর ভাল লাগে না।😭

    Reply
  4. এই দিনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত হাসান বসরী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন-

    ﻗﺎﻝ ﺣﺴﻦ ﺍﻟﺒﺼﺮﻱ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﯽ ﻋﻨﻪ ﻭﺩﺩﺕ ﻟﻮ ﮐﺎﻥﻟﯽ ﻣﺜﻞ ﺟﺒﻞ ﺍﺣﺪ ﺫﮬﺒﺎ ﻓﺎﻧﻔﻘﺘﻪ ﻋﻠﯽ ﻗﺮﺍﺀﺓ ﻣﻮﻟﺪ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﯿﻪ ﻭﺳﻠﻢ
    অর্থাৎ- যদি আমার উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত তাহলে আমি তা রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
    সাল্লাম এর জন্মদিন উপলক্ষে মাহফিলে খরচ করতাম।
    [সূত্রঃ আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১১।]

    Reply

Leave a Comment